অতীতে না”রীরা মুড সুইং বা বিষণ্নতায় ভুগলে তাদেরকে স্বামীরা চিকিৎসকের কাছে.

বর্তমান সময়ে মুড সুইং, বিষণ্নতা, উদ্বেগ কিংবা অন্যান্য মানসিক সমস্যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের আলোকে বোঝার চেষ্টা করা হয়। চিকিৎসকরা রোগীর শারীরিক ও মানসিক অবস্থা, পারিবারিক পরিস্থিতি এবং অন্যান্য কারণ বিবেচনা করে চিকিৎসার পরামর্শ দেন। কিন্তু ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, নারীদের মানসিক ও আবেগজনিত সমস্যাকে একসময় সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হতো।

অতীতে কোনো নারী দীর্ঘ সময় মন খারাপ করে থাকলে, হঠাৎ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লে, অস্বাভাবিক উদ্বেগে ভুগলে বা আচরণে পরিবর্তন দেখা দিলে পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন হতেন। অনেক ক্ষেত্রে স্বামী বা পরিবারের অন্য সদস্যরা চিকিৎসকের পরামর্শ নিতেন।

তবে সেই সময়ের চিকিৎসাব্যবস্থা আজকের মতো আধুনিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক ছিল না।

‘হিস্টেরিয়া’ নামে ব্যাখ্যা করা হতো নানা সমস্যা

ইতিহাসবিদ ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা যায়, বহু শতাব্দী ধরে নারীদের বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক সমস্যাকে ‘হিস্টেরিয়া’ নামে চিহ্নিত করা হতো। প্রাচীন গ্রিক শব্দ থেকে আসা এই ধারণার সঙ্গে নারীর জরায়ুকে যুক্ত করা হয়েছিল।

ফলে বিষণ্নতা, উদ্বেগ, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, ভয়, আবেগের পরিবর্তনসহ বিভিন্ন ধরনের উপসর্গকে অনেক সময় একই ছাতার নিচে ফেলা হতো। বর্তমানে যেসব সমস্যাকে আলাদা আলাদা মানসিক বা স্নায়বিক অবস্থার অংশ হিসেবে দেখা হয়, অতীতে সেগুলোর অনেককেই ভুল ধারণার ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

চিকিৎসার জন্য নেওয়া হতো চিকিৎসকের কাছে

কোনো নারী দীর্ঘদিন অস্বাভাবিক আচরণ করলে বা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকলে পরিবার চিকিৎসকের সাহায্য চাইত। তবে চিকিৎসকদের ধারণা সবসময় সঠিক ছিল না।

বিভিন্ন সময়ে চিকিৎসার নামে বিশ্রাম, আলাদা করে রাখা, গোসল, শরীরচর্চা, ভেষজ উপাদান এবং অন্যান্য পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। উনিশ শতকে কিছু ক্ষেত্রে ‘রেস্ট কিউর’ বা দীর্ঘ সময় বিশ্রামে রাখার পদ্ধতিও জনপ্রিয় ছিল।

কিন্তু ইতিহাস বলছে, এসব পদ্ধতির অনেকগুলোর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ছিল দুর্বল। বরং কিছু ক্ষেত্রে নারীদের কষ্ট আরও বেড়ে যেত।

সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিও ছিল বড় একটি কারণ

অতীতে নারীদের আবেগ ও আচরণকে প্রায়ই পুরুষদের তুলনায় ভিন্ন চোখে দেখা হতো। একজন নারী প্রতিবাদ করলে, নিজের মত প্রকাশ করলে বা প্রচলিত সামাজিক নিয়মের বাইরে আচরণ করলে অনেক সময় সেটিকেও মানসিক সমস্যার লক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা হতো।

এর ফলে প্রকৃত মানসিক অসুস্থতা, পারিবারিক নির্যাতন, সামাজিক চাপ, দুঃখ কিংবা ব্যক্তিগত সংকট—এসবের মূল কারণ অনেক সময় গুরুত্ব পেত না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে অতীতের অনেক ধারণার মধ্যে সামাজিক ও লিঙ্গভিত্তিক পক্ষপাত কাজ করেছিল।

সব সমস্যার কারণ নারীর শরীর—এমন ধারণাও ছিল

একসময় চিকিৎসাবিজ্ঞানে এমন ধারণা প্রচলিত ছিল যে, নারীর মানসিক ও আবেগজনিত সমস্যার প্রধান কারণ তার প্রজননব্যবস্থা।

এই ধারণার কারণে অনেক চিকিৎসক নারীদের বিষণ্নতা বা আচরণগত পরিবর্তনের প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করার পরিবর্তে শারীরিক কিছু পুরোনো তত্ত্বের ওপর নির্ভর করতেন।

বর্তমান চিকিৎসাবিজ্ঞান অবশ্য অনেক দূর এগিয়েছে। এখন বিষণ্নতা বা মুডের পরিবর্তনকে শুধুমাত্র নারী হওয়ার কারণে ব্যাখ্যা করা হয় না। জৈবিক, মানসিক, পারিবারিক, সামাজিক ও পরিবেশগত—বিভিন্ন বিষয় একসঙ্গে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

আধুনিক যুগে বদলেছে চিকিৎসার ধারণা

বর্তমানে বিষণ্নতা ও অন্যান্য মানসিক সমস্যাকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, মনোবিজ্ঞানী ও অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবাকর্মীরা রোগীর অবস্থা মূল্যায়ন করেন।

কাউন্সেলিং, সাইকোথেরাপি, জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ ব্যবহার করা হতে পারে।